ভারতের রাজধানী দিল্লিতে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও পরীক্ষাসংক্রান্ত অনিয়মের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন নতুন মোড় নিয়েছে। প্রথমে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হলেও এখন আন্দোলনকারীরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ দাবি করছেন। বিরোধী দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার পর আন্দোলন আরও জোরালো হয়েছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার (২২ জুলাই) রাজধানীর যন্তর মন্তরে অনলাইনভিত্তিক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর ডাকে কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা যন্তর মন্তর ছাড়বেন না।
সমাবেশে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ‘যে দেশে মানুষ প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছিল, যে দেশে সরকারের সমালোচনাকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে দেখা হতো, আমরা সেই দেশকে আবার জাগিয়ে তুলেছি।’
মূলত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট) এবং অন্যান্য জাতীয় পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন আন্দোলনকারীরা।
মঙ্গলবার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন আন্দোলনকে আরও গতি দেয়। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়ে সরকারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। পরে তাকে প্রতিবাদস্থল থেকে আটক করে কয়েক ঘণ্টা পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়। বুধবার কালো পোশাক পরে সংসদে গিয়ে সরকারের জবাবদিহি দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবও সংসদ চত্বরে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বলেন, দেশের কোটি তরুণের ভবিষ্যতের সাথে জড়িত একটি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নীরব রয়েছেন।
আন্দোলনের পেছনে থাকা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র জন্মও একটি বিতর্কিত ঘটনার পর। গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আদালতে এক শুনানিতে তরুণদের ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) ও ‘পরজীবী’র সাথে তুলনা করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সেই মন্তব্যের প্রতিবাদ থেকেই অনলাইনভিত্তিক এই আন্দোলনের সূচনা, যা এখন লাখো তরুণের সমর্থন পেয়েছে।
সোমবার সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর দিন আন্দোলনকারীরা পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। পরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এই আন্দোলনকে গত পাঁচ বছরের মধ্যে দিল্লির সবচেয়ে বড় তরুণদের গণবিক্ষোভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলেছে, দিল্লি পুলিশের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার প্রশ্ন তুলেছে।
তবে বুধবার আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা একটি আবেদন শুনতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।
এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাব্য নামের ২০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি ভয় পেয়েছি। কারণ পুলিশকে আন্দোলনকারীদের মারধর করতে দেখেছি। কিন্তু আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানিয়েছেন, সরকার পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এবং এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা করতে প্রস্তুত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কাছে আমাদের জবাবদিহি, সংস্কার এবং দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। তারা বিশৃঙ্খলা নয়, সমাধান পাওয়ার যোগ্য।’
এরই মধ্যে দিল্লির বাইরে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও গোয়াসহ ভারতের বিভিন্ন শহরেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে।
সূত্র: এএফপি
