ড্যালাসের আকাশ জুড়ে তখন বিষাদের কালো মেঘ। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও মহাকাব্যিক একটি অধ্যায়ের ওপর চিরতরে নেমে এল অন্ধকার ।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ‘রাউন্ড অব ১৬’-এর হাইভোল্টেজ আইবেরিয়ান ডার্বিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল পর্তুগাল। আর এই হারের সাথেই ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে শেষ হয়ে গেল অন্যতম সেরা তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বর্ণাঢ্য, রাজকীয় ও অলৌকিক আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষে ম্যাচটি যখন অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর অপেক্ষায়, ঠিক তখনই যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে (৯১ মিনিটে) ফেরান তোরেসের পাস থেকে মিকেল মেরিনোর এক নিখুঁত ফিনিশিংয়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় পর্তুগিজদের রক্ষণ। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর ড্যালাসের পিচে যখন স্প্যানিশ যুবকদের বাঁধভাঙা উল্লাস, তখন ৪১ বছর বয়সী পর্তুগিজ যুবরাজ চোখের জল মুছতে মুছতে সম্পূর্ণ একা একা মাঠ ছেড়ে টানেলের দিকে হেঁটে যান।
অথচ এই বিশ্বকাপেই ফুটবল ইতিহাসের প্রথম মানব হিসেবে টানা ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার এক অবিস্মরণীয় মহাকীর্তি গড়েছিলেন সিআরসেভেন। কিন্তু রেকর্ড বইয়ে তার নাম উজ্জ্বল হলেও, মাঠের পারফরম্যান্সে ৪১ বছরের শরীরের সাথে সময়ের নির্মমতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। গ্রুপ পর্বের দুর্বল দল উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দুটি গোল আর নকআউটের প্রথম ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একটি পেনাল্টি গোল বিশ্বকাপে এটুকুই ছিল তার সেরা কন্ট্রিবিউশন। স্পেনের বিপক্ষে আজকের বাঁচা-মরার লড়াইয়ে রবার্তো মার্টিনেজের ছকে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থাকলেও স্প্যানিশ ডিফেন্সের কড়া পাহারায় তিনি ছিলেন পুরোপুরি নিষ্প্রভ। প্রথমার্ধে সিআরসেভেন বল ছুঁতে পেরেছিলেন মাত্র ১২ বার, যা মাঠে থাকা অন্য যেকোনো ফুটবলারের চেয়ে কম। এমনকি স্পেনের সেন্টার ফরোয়ার্ড মিকেল ওইয়ারসাবালও রোনালদোর চেয়ে ৯ বার বেশি বল স্পর্শ করেছিলেন। যার ফলে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই ৪১ বছরের রোনালদোকে প্রতিটি ম্যাচে খেলানো নিয়ে কোচ মার্টিনেজকে কঠিন ও বিব্রতকর সব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
যদি আজ ড্যালাসের রাতটিই পর্তুগালের লাল-সবুজ জার্সিতে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শেষ রাত হয়ে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের পরিসংখ্যানের পাতা চিরকাল তার শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দেবে। পর্তুগালের হয়ে রেকর্ড ২৩৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন তিনি, যেখানে তার নামের পাশে ১৪৬টি গোল এবং ৪৬টি অ্যাসিস্ট। তার জাদুকরী নেতৃত্বেই পর্তুগাল জিতেছিল ২০১৬ সালের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (ইউরো) এবং ২০১৯ ও ২০১৫ সালের দুটি উয়েফা নেশনস লিগের ট্রফি। ফুটবল ইতিহাসের ক্লাব থেকে শুরু করে জাতীয় দলের হয়ে প্রায় সব বড় ট্রফি জিতলেও, কেবল সোনার তৈরি ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখার অধরা স্বপ্ন নিয়েই ফুটবলকে বিদায় জানাতে হলো এই কিংবদন্তিকে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর এই প্রস্থান ফুটবল বিশ্বের জন্য কেবল একটি যুগের অবসানই নয়, বরং ফুটবল মাঠের এক চিরন্তন অশ্রুসিক্ত মহাকাব্যের ট্র্যাজিক সমাপ্তি।
